দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমছে, জন্মহার নেমে যাচ্ছে রেকর্ড সর্বনিম্নে। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকদের জীবনসঙ্গী খুঁজে দিতে এবার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার। সরকারি কর্মীদের জন্য চালু করা হয়েছে বিশেষ ম্যাচমেকিং বা জীবনসঙ্গী খোঁজার সেবা ‘ফার্স্টডেট’।
চলতি সপ্তাহে চালু হওয়া পরীক্ষামূলক এই সেবাটি ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সরকারি কর্মীদের জন্য। এর বিশেষত্ব হলো, প্রচলিত ডেটিং অ্যাপের মতো একের পর এক ব্যক্তির ছবি দেখিয়ে পছন্দ-অপছন্দ জানানোর বদলে একবারে একজন সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হবে।
‘ফার্স্টডেট’ জানিয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের পছন্দ, অভ্যাস ও মূল্যবোধ সম্পর্কে একটি প্রশ্নমালা পূরণ করতে হবে। এরপর নোবেল পুরস্কারজয়ী গণিতভিত্তিক একটি অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তাদের মধ্যে মিল খোঁজা হবে।
সেবাটিতে অংশ নিতে জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থার মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়। এরপর অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের জন্য সম্ভাব্য সঙ্গী নির্বাচন করা হয়।
এই উদ্যোগকে পরিচালনা করছে সিঙ্গাপুরের সরকারি প্রযুক্তি সংস্থা গোভটেক। বর্তমানে এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
নোবেলজয়ী অ্যালগরিদমে সঙ্গী খোঁজা
‘ফার্স্টডেট’-এর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই সেবায় গেইল-শ্যাপলি ‘স্টেবল ম্যারেজ’ অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি এমন একটি গাণিতিক কাঠামো, যেখানে দুই পক্ষের পছন্দের ভিত্তিতে সমানসংখ্যক মানুষের মধ্যে জোড়া তৈরি করা হয়।
এই অ্যালগরিদমের অন্যতম উদ্ভাবক প্রয়াত গণিতবিদ লয়েড শ্যাপলি। এর আবিষ্কারের জন্য ২০১২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার পান তিনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চিকিৎসকদের আবাসিক প্রশিক্ষণে নিয়োগ এবং বিভিন্ন ডেটিং সেবায়ও এই অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ২৯ বছর বয়সী এলিজাবেথ এই সেবাটি ব্যবহার করতে আগ্রহী। বিবিসিকে তিনি বলেন, কোনো অ্যাপের মাধ্যমে কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা বিভিন্ন ধরনের অ্যাপের ক্ষেত্রে খুব একটা আলাদা নয়। তবে সরকারি কর্মীদের জন্য হওয়ায় প্রতারণার ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
‘ফার্স্টডেট’ চালুর পর সিঙ্গাপুরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ উদ্যোগটিকে অস্বস্তিকর ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক বলে সমালোচনা করেছেন। আবার কেউ কেউ এতে অংশ নেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকজন ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, শুধু সরকারি কর্মীদের জন্য এই সেবা চালু করায় সরকারি চাকরিতে নেই এমন ব্যক্তিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কি না। বয়সসীমা নিয়েও সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ।
একজন রেডিট ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য সন্তান জন্মের হার বাড়ানো, জীবনসঙ্গী খুঁজে দেওয়া নয়। বয়স ৩৫ বা তার বেশি হলে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি ঝুঁকি থাকায় বয়স্ক অবিবাহিতদের এই উদ্যোগের বাইরে রাখা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ভবিষ্যতে ‘ফার্স্টডেট’ সেবা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে বিবিসি গোভটেকের কাছে মন্তব্য চেয়েছে।
রেকর্ড সর্বনিম্নে সিঙ্গাপুরের জন্মহার
‘ফার্স্টডেট’ চালুর সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। সিঙ্গাপুরে জন্মহার দীর্ঘদিন ধরেই কমছে। ২০২৫ সালে গত ৬০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশটিতে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ৩০ হাজারের নিচে নেমে যায়।
অন্যদিকে দেশটির বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে প্রায় ২৬ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়।
এ পরিস্থিতিতে গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং পরিবারকে সহায়তা এবং সন্তান নেওয়ার প্রবণতা বাড়াতে নতুন কয়েকটি উদ্যোগ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে প্রতিটি শিশুর ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এর আগেও ছিল সরকারি উদ্যোগ
সিঙ্গাপুর সরকারের নাগরিকদের জীবনসঙ্গী খুঁজে দেওয়ার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮৪ সালে সরকার ‘সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইউনিট’ নামে একটি সংস্থা গঠন করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল স্নাতক অবিবাহিতদের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের লক্ষ্য করায় তখন ওই উদ্যোগকে অভিজাতপন্থী বলে সমালোচনা করা হয়েছিল। তবে কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, স্নাতক নন এমন ব্যক্তিদের জীবনসঙ্গী খুঁজে পেতে তেমন সমস্যা হয় না। পরে ওই সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পরের বছর স্নাতক নন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে বিয়ে উৎসাহিত করতে আরেকটি সরকারি সংস্থা গঠন করা হয়।
সরকারি উদ্যোগে জীবনসঙ্গী খোঁজার ঘটনা অবশ্য শুধু সিঙ্গাপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। জাপানেও জন্মহার কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে টোকিও মহানগর সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি ডেটিং অ্যাপ চালু করে।
টোকিও সরকারের জুলাইয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে ২৬৫টি দম্পতির বিয়ে হয়েছে।
/অ